চে গেভারা, বিপ্লবী না ফ্যাশন প্রতীক

লেখক : সেভোলিন ব্যারো ডায়াস
অনুবাদ : শাহরিয়ার পারভেজ

CheHigh
১৯৬০ সালে লা কব্রে মেমোরিয়াল সার্ভিসে চিত্রশিল্পী আলবের্তো কোর্দার তোলা ছবি।

এর্নেস্তো চে গেভারার সেই স্বর্গীয় প্রতিচ্ছবি এখন সারা বিশ্বের আনাচে কানাচে দেয়ালচিত্র, কম্পিউটার ওয়ালপেপার কিংবা স্ক্রিনসেভার, রক ব্যান্ডের পোস্টার, বেইসবল টুপি, পোস্টকার্ড, লাইটার এবং অন্যান্য দ্রব্যের আকর্ষণীয় বিজ্ঞাপন হিসাবে শোভা পাচ্ছে। যদিও বিখ্যাত বেরেটুপি, লম্বা চুল, দৃঢ়তায় ভরা আশ্চর্য দু’টি চোখ এখনও লক্ষ কোটি শোষিত প্রতিবাদমুখর মানুষের হৃদয়ে ঝড় তোলে। কারো কারো কাছে নেহাত-ই একজন হত্যাকারী আবার কারো কারো কাছে বিশেষ করে কিউবানদের নিকট তিনি বীর বিপ্লবী, ক্যুবায় সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার অন্যতম আলোকবর্তিকা। শুধু কিউবান কেন, তিনি পুরো লাতিন আমেরিকাতে মুক্তির বাণী তথা আলোকবর্তিকার আলো ছড়িয়ে দিতে চেয়েছিলেন। যদিও বিশ্বের কিছু মানুষ তাঁর মতামতের সাথে ভিন্নতা পোষণ করলেও বর্তমানে তারা অভিন্ন অন্তত চে যেসব পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। যার অন্যতম কারণ এবং দৃষ্টান্ত দি মোটর সাইকল ডায়ারিস (২০০৪) চলচ্চিত্রটি। যা মানুষের চিন্তা-ভাবনাকে করেছে আরো গতিশীল। যেখানে চে শুধু একা নন বরং যারাই এই চলচ্চিত্রটি দেখেছেন তারাও স্বচক্ষে দেখেছেন তৎকালীন লাতিন আমেরিকার দুরবস্থা। মূলত এটি চে’র জনপ্রিয়তাকে নিয়ে গেছে সাধারণ মানুষের আরো কাছে গভীর অন্তঃস্থলে। চে’র ছবি কিংবা পোস্টার নিয়ে আজকাল অনেক ব্যবসায়ী তথা কিছু মুনাফালোভী ব্যবসা করছে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে। যদিও এর বিপক্ষে প্রতিনিয়ত প্রতিবাদ জানিয়ে যাচ্ছে কিছু মানুষ যারা চে’র বাণী তথা মতাদর্শ-চিন্তা ভাবনাকে অন্তরে লালন পালন করেন। তাদের-ই একজন ভ্যালেনটিন প্রিটো যিনি একজন কিউবান-আমেরিকান, যার নিজের একটি ওএবসাইট আছে এবং সদস্যগণ প্রতিনিয়ত মেইল করেন এবং মতামত আদান প্রদান করেন চে সম্পর্কে। সে-সব মেইল কিংবা মতামতের অধিকাংশ জুড়ে থাকে চে কে ফ্যাশনবিরোধী হিসাবে প্রকাশ করার জন্যে। চে’র ছবি ফ্যাশন ও অন্যান্য দ্রব্যে ব্যবহার না করার প্রতিবাদী হিসাবে এই কিউবান-আমেরিকান বলেন, ‘তোমার সন্তান চে’র ছবি সম্বলিত টি-শার্ট পরিধান করেছে, কিন্তু সে জানেনা চে কে ছিলেন? তিনি কি কোন হলিউড অ্যাকশন হিরো, নাকি বিপ্লবী, নাকি একজন হত্যাকারী?’

এর্নেস্তো চে গেভারা ডি লা সেরনা একজন আর্জেন্টাইন ডাক্তার যিনি ফিদেলের সাথে মিলিত হয়ে স্বৈরশাসক বাতিস্তার বিরুদ্ধে সাধারণ জনগণের সাথে একাত্মতা ঘোষণা করে বিপ্লব গড়ে তুলেছিলেন এবং সফলও হয়েছিলেন, যার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত আজকের কিউবা তথা লাতিন আমেরিকার অনেক দেশ আজ চে’র চেতনা ও মতাদর্শে বিশ্বাসী। এই বিশ্বাস তারা শুধু ফ্যাশনের গণ্ডিতে আবদ্ধ রাখেননি। কিউবার স্বাধীনতার পর চে কে দেয়া হয়েছিল বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদ এবং রাষ্ট্রদূত হিসেবে তিনি ভ্রমণ করেছেন পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ। কিন্তু ১৯৬৭ সালে আমেরিকার সাম্রাজ্যবাদপুষ্ট বলিভিয়ার সরকারের সৈন্যদের হাতে ধৃত হন এবং পরবর্তীতে তাঁকে নিমর্মভাবে গুলি করে হত্যা করা হয়। তৎকালীন বলিভিয়ান সেনাবাহিনীর সাহায্যে আমেরিকান সরকার চেয়েছিল শুধুমাত্র চে কে হত্যা করা নয় বরং চে’র মানবতার বাণী ধূলোতে মিশিয়ে দেয়া ছিল তাদের অন্যতম লক্ষ্য, কিন্তু আজ বিশ্বের চারদিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করলে প্রতীয়মান হয় তারা কতই না বোকা কিংবা ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। মূলত চে’র মৃত্যুর পরই চে’র শাশ্বত বাণী এবং কর্মকাণ্ডের বিস্তৃতি লাভ করেছিল সারা বিশ্বে, আর এজন্যেই বলা হয় চে গেভারা এমন একটি নাম যার অগ্নিশিখা কখনও নিভে যায় না। প্রিটো বলেন, যদিও আমি চে কে দেখিনি স্বচক্ষে কিন্তু আমার মা-বাবা তাঁকে দেখেছেন এবং তাঁর বিপ্লব ও আদর্শের সমর্থক ছিলেন। তারা ভুলেও কল্পনা করতে পারেন না সেই দৃশ্য যে দৃশ্যে একজন তরুণ চে’র টি-শার্ট পরিহিত অবস্থায় কোন মেয়েকে ধর্ষণ করছে। আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি যারা চে গেভারার ছবি সম্বলিত টি-শার্ট পরিধান করবেন তারা অন্তত চে’র পথের অনুসারী হবেন, পুরোপুরি সম্ভব না হলেও আংশিক। নেহাৎ ফ্যাশনের জগতে চে কে আবদ্ধ করে রাখা গুরুতর অপরাধ।

লস অ্যাঞ্জেলেসের লা লিংগ, একটি বিশাল ব্যয়বহুল শিশুদের পোশাকের দোকান, যেখানে চে’র ছবিসম্বলিত বহুবিধ দ্রব্যসহ টি-শার্ট বিক্রি করা হয়। তারা নিয়মিত অনলাইনে বিজ্ঞাপন দিয়ে থাকেন যার একটি হল, ‘তোমার ছোট্ট শিশুটি কি বিপ্লবী চে’র ছবি সম্বলিত টি-শার্ট পরিহিত? যদি তোমার উত্তর না হয় তাহলে দেরি না করে আমাদের দোকানে এসে পছন্দমত কিনে নিতে পারো! এ সুযোগ সীমিত সময়ের জন্যে।’ সত্ত্বাধিকারী লিভ চ্যান বলেন, চে’র ছবিসম্বলিত টি-শার্টসহ অন্যান্য দ্রব্যাদি বাকি দ্রব্যের চাইতে বেশি বিক্রি হয়। চে’র ছবি শুধু ছবি, নিছক ফ্যাশন মাত্র। এই অনলাইন বিজ্ঞাপনের পরপরই চ্যান’র স্টোরে বিক্রি বর্ধিত হয় এবং প্রচুর চে’র ছবি সম্বলিত টি-শার্টের পাশাপাশি অন্যান্য দ্রব্যাদি বিক্রি হয় কিন্তু এর বিপরীতও ঘটে। বিজ্ঞাপনের কয়েকদিন পর তার দোকানের বাইরে শত শত চে সমর্থক বিভিন্ন মিছিল ব্যানার সহকারে তাদের বিক্ষোভ অব্যাহত রাখে। পরবর্তীতে চ্যান স্বীকার করতে বাধ্য হন স্থানীয় পত্রিকায়, আমি চে সম্পর্কে তেমন কিছুই জানি না, শুধুমাত্র তাঁর জনপ্রিয়তাকে পুঁজি করে আমি তাঁর ছবি সম্বলিত টি-শার্ট বিক্রি করি। কিন্তু এমন অনেককে আমি দেখেছি, অনেক বয়স্ক মানুষ চে’র টি-শার্ট পরিধান করেন শুধুমাত্র ফ্যাশনের উপকরণ হিসেবে, রাজনৈতিক মতাদর্শ থেকে নয়। আমার চোখে চে’র ছবি শুধু মুনাফা লাভের হাতিয়ার মাত্র। কারণ চে’র ছবির উপর কোনো কপিরাইট না থাকাতে আমাদের মত ব্যবসায়ীরা তাঁকে নিয়ে ব্যবসা করবে এটাই ধ্রুব সত্যি।’ শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত চ্যান চে’র ছবি সম্বলিত দ্রব্যাদি বিক্রি অব্যাহত রেখেছেন। এভাবেই ব্যবসা করছে অহরহ কারলিঙ্গটন কোট ফ্যাক্টরি, যদিও চে সমর্থকদের প্রবল প্রতিবাদের মুখে ঐ-প্রতিষ্ঠান থেকে তাঁর ছবিসম্বলিত সকল টি-শার্ট সরিয়ে নেয়া হয়। প্রতিষ্ঠানটির সত্ত্বাধিকারী এ্যাপাম্যান শেষ পর্যন্ত স্বীকার করেন, সত্যিই চে’র টি-শার্টসহ অন্যান্য দ্রব্যাদি বিক্রির হার ছাড়িয়ে গেছে অন্যান্য বস্তুর চাইতে। অবশ্য সম্প্রতি আমেরিকার ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান টার্গেট বের করেছে চে’র ছবিসম্বলিত শিশুদের মোজা (শক্স), যদিও পুরো আমেরিকা জুড়ে প্রতিবাদের ঝড় উঠেছিল এবং শেষ পর্যন্ত শিশুদের সেসব দ্রব্য সরিয়ে নিতে বাধ্য হয়। তবে মুনাফালোভী ব্যবসায়ীদের জন্যে দুঃসংবাদ, অতি শীঘ্রই চে’র যাবতীয় ছবি কপিরাইটের আওতায় আনা হচ্ছে আর এতে অগ্রণী ভূমিকা রাখছেন আলবার্তো কোরডার কন্যা ডানা এবং চে গেভারার কন্যা অ্যালাইদা গেভারা মার্চ। গ্লোরিয়া লা রিভা, যিনি ৫ জন কিউবানকে নিজ চেষ্টায় মুক্তি দিয়েছিলেন আমেরিকায় গুপ্তচরগিরি অপবাদ থেকে। তিনি বলেন, ১৯৭০ সাল থেকে আমি চে’র ছবি সম্বলিত পোস্টার সংগ্রহ করে আসছি শুধুমাত্র হৃদয়ের তাগিদে। চে গেভারা তাঁর জীবন দান করে গেছেন বিশ্ব-মানবতা, নিঃস্বার্থতা আর সাম্যের জন্যে। তিনি বলিভিয়ার সাধারণ মানুষকে সাহায্য করতে চেয়েছিলেন কিন্তু বিশ্বের সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলোর কাছে চে গেভারা আজও ঘৃণিত একপেশে শুধুমাত্র তাঁর নীতি আর জনকল্যাণমূলক পদপেগুলোর জন্যে। লা রিভা আশা পোষণ করেন যে, চে শুধু টি-শার্টের ফ্যাশনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবেন না বরং তাঁর অনুপ্রেরণা আর সাম্যের বাণী ছড়িয়ে পড়বে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে। প্রিটো বলেন, চে’র সবকটি ছবির উপর কপিরাইট আইন দৃঢ় করতে হবে যাতে ব্যবসায়ীরা নিছক মুনাফা লাভের জন্য তাঁকে ব্যবহার করতে না পারে। যা আলবার্তো কোরডা করেছিলেন কিন্তু সেই কপিরাইটের সময়সীমা শেষ হয়ে গিয়েছে। কিন্তু পরবর্তীতে তা আর নবায়ন করা হয়নি। কিউবান সরকারের এখনই সময় চে’র প্রতিটি ছবির উপর কপিরাইট দৃঢ় করা। চে গেভারা একজন মহান বিপ্লবী এবং সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী। কিন্তু কিছু কুচক্রী মুনাফালোভী তাঁকে ব্যবসায়িক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে বছরের পর বছর। যা তাঁর ইমেজ তথা বৈপ্লবিক মতবাদকে অন্যদিকে নিয়ে যাচ্ছে। তাদের প্রতি অনুরোধ চে’র জনপ্রিয়তাকে সাধারণ মানুষের কাছে যথাযোগ্যভাবে উপস্থাপন করার ব্যবস্থা নেয়া উচিত, নিতান্ত ফ্যাশনের উপকরণ হিসাবে নয়।


শঙ্খবাস | প্রথম সংখ্যা | আগস্ট ২০০৯

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this:
search previous next tag category expand menu location phone mail time cart zoom edit close