নাটক : আমাদের স্বপ্ন আমাদের স্বপ্নভঙ্গ

লেখক : প্রদীপ দেওয়ানজী

বাঙালির হাজার বছরের ইতিহাসে নাট্যচর্চার ইতিহাস বেশ পুরোনো হলেও নতুন ধরনের নাট্যচর্চা, যাকে আমরা গ্র“প থিয়েটার বলছি তার বয়স বাংলাদেশের সমান। স্বাধীনতা পূর্বকালে তৎকালীন পূর্ব-পাকিস্তানে ভীষণ রকম জনপ্রিয় ছিল যাত্রা। মৌসুমে অর্থাৎ বর্ষার পর থেকে পুরো শীত এবং বসন্তকাল জুড়ে গ্রামে-গ্রামে বসত যাত্রা-পালার আসর। মানুষ বুঁদ হয়ে সেইসব যাত্রা-পালা উপভোগ করতো। যে ক’দিন যাত্রা-পালা হতো সে ক’দিন গ্রামের মানুষের সরল, প্রাণবন্ত অথচ একরৈখিক জীবন এলোমেলো হয়ে যেত। তাদের ভাবনার জগতে, আবেগের দুনিয়ায় একটা ঝড়ো হাওয়া লাগত। মনটা উড়াল দিতে চাইত কোথায় যেন! ভেলায় লক্ষ্মীন্দরের মৃতদেহের সাথে কোন সে নদী সাগর অথবা গ্রামে তাঁবু ফেলে নদের চাঁদকে প্রেমের সাগরে ডুবিয়ে দিয়ে হঠাৎ উধাও হয়ে যাওয়া বেদের মেয়ে অথবা রহীম বাদশাকে নিয়ে পাহাড়ে জঙ্গলে ঘুরে বেড়ানো রূপবানের সাথে উড়ে বেড়াতো মন। কোথাও থিতু হতে চাইতো না। সবার, বিশেষ করে প্রেমের জন্য যে কোন ত্যাগ স্বীকারে আকুল তরুণ-যুবাদের অবস্থা হতো বেহাল। সবার মধ্যেই থাকত কমবেশি ঘোরলাগা অবস্থা। শুধু গ্রামের কথা বলছি কেন, শহরেও যাত্রার এই ঘোর লাগানোর মতার প্রয়োগ ঘটত। মৌসুমে শহরেও যাত্রাগানের আসর বসত। কয়েকদিন ধরে যাত্রা-পালা পরিবেশিত হতো। মানুষ ঝাঁপিয়ে পড়ত যাত্রা-পালায়। দেখা যেত একই লোক প্রতিদিন সারারাত ধরে যাত্রা দেখত। একটা নেশা— তবে সে নেশা খারাপ নয়। রাত জাগা ছাড়া কোনদিক থেকেই স্বাস্থ্যহানিকরও নয়। আমার নিজের একটা স্মৃতির কথা বলি। তখন বেশির ভাগ যাত্রা-পালার আসর বসত এখনকার স্বপনপার্ক বা রাইফেলকাব (শহীদ মিনার সংলগ্ন) মাঠে। সপ্তাহ বা পকাল ধরে যাত্রা-পালা হতো। আমার তখন কাঁচা বয়স। কাস সেভেন-এইটে পড়ি। ঘর থেকে একা বেরুবার অনুমতি ছিল না, আর রাত জেগে যাত্রা-পালা দেখা! কিন্তু দেখার লোভ সামাল দেয়া কঠিন। তাই একটা কৌশলের আশ্রয় নিতাম। কৌশলটার চরিত্র কি জানি না, কিন্তু খুব কার্যকরী ছিল। বাবা বা মা’র কোন যুবক বয়সী আত্মীয়-স্বজন এলে তাদেরকে যাত্রা বা সিনেমা দেখানোর জন্য পটিয়ে ফেলতাম। তারা আমাকে যাত্রা বা সিনেমা দেখাতে চাইলে অভিভাবক মহলে তেমন আপত্তি উঠত না। সেভাবেই একবার যাত্রা দেখেছিলাম। সারারাত ধরে। ভোর রাতে এসে ঘুম। ঘুম থেকে ওঠার পর দেখলাম, আমি আর আমি নেই। প্রতিদিনের আমিকে লুট করে নিয়ে গেছে যাত্রা-পালার কোন চরিত্র। কি করি! কি করি! বিকালে আবার গেলাম যাত্রা প্যান্ডেলে। সেখানে তখন ভাঙ্গনের সুর। যাত্রাদল পাততাড়ি গুটাচ্ছে। উড়াল দেবে অন্য কোথা, অন্য কোনোখানে। আমার মতো আরও কয়েকজনকে দেখলাম সেখানে। আমার সেদিন মনে হয়েছিল— ওরা সবাই বোধহয় আমি। যাত্রা ছাড়াও সে-সময়কালের পুঁথিপাঠ, কৃষ্ণলীলার একক অভিনয়ের কথা এখনো স্মৃতিতে ভীষণভাবে উজ্জ্বল হয়ে আছে। এসবই নাটক। স্বাধীনতা-উত্তর আমাদের যে পুরোপুরি ইউরোপিয় ঘরানার চারদেয়ালের মধ্যের থিয়েটার, যাকে আমরা প্রসেনিআম থিয়েটার বলি, তাকে কেন্দ্র করে থিয়েটারের সে সংজ্ঞা তার সাথে মিল খুঁজে পাওয়া যাবে না, কিন্তু এসবই নাটক, আমাদের শেকড়ের নাটক। আমাদের, একেবারেই আমাদের নাটক। সেইসব নাটকে সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক মতবাদ বা বৈজ্ঞানিক মঞ্চচিন্তা বা বৈজ্ঞানিক অভিনয়শৈলীর প্রকাশ ছিল না, কিন্তু ছিল প্রচণ্ড মাদকতা, যা এই ভাটি-অঞ্চলের মানুষকে মজিয়ে রাখবার এক আশ্চর্য মতা রাখত।

নতুন ধরনের নাট্যচর্চার আত্মপ্রকাশ ঘটেছিল নতুন চিন্তা, নতুন প্রেরণা, নতুন শক্তি ও আধুনিকতাকে ধারণ করে। ইতিহাস সৃষ্টি করা নৃশংসতা, বর্বরতা আর আত্মত্যাগের মাধ্যমে অর্জিত বাংলাদেশ যে-স্বপ্নকে ধারণ করেছিল যুদ্ধের দশমাস ধরে, সে স্বপ্নকে বাস্তবায়নে সক্রিয় হয়ে উঠল নতুন দেশের মানুষরা। বিশেষত তরুণ-যুবারা। তাদের শপথ— রক্তে ভেজানো স্বপ্নকে হাতছাড়া করা যাবে না। স্বপ্নকে চাই হাতের মুঠোয়। আর যাদের বেঁচে থাকার কথা নয়, যাদেরকে দুঃস্বপ্ন তাড়িয়ে বেড়ানোর কথা তারা আবার দুঃস্বপ্নকে স্বপ্নে পরিণত হবার সম্ভাবনা তৈরি হতে দেখল। পঁচাত্তরের বাংলাদেশের চাকা যখন উল্টোপথে চলতে শুরু করল তখন প্রথমবারের মতো মুক্তিযুদ্ধের অর্জিত স্বপ্ন আস্তে আস্তে দূরে সরে যেতে থাকল। হোঁচট খেল বাংলাদেশ। হোঁচট খেল নাট্যচর্চা। কিন্তু থেমে থাকল না। এগিয়ে চলল। মঞ্চ হয়ে উঠল প্রতিবাদের প্রতীক। প্রায় হাতছাড়া হয়ে যাওয়া স্বপ্নের জন্য আহাজারী, আর্তনাদকে সার্থকভাবে ধারণ করল বাংলাদেশের নাটক। আমাদের নাট্যকাররা পঁচাত্তর-পরবর্তী সময়ের শকুনের নোংরা থাবার তলায় বাংলাদেশকে যেমন আন্তরিকতায়, কান্নায়, ভালবাসায় তুলে আনলেন, প্রায় সমান গুরুত্বে তুলে আনলেন বাংলার দারিদ্র্যজর্জরিত সরলপ্রাণ মানুষের অব্যক্ত কান্নাকে। তুলে আনলেন সেইসব সাহসী মানুষদের নিষ্পেষিত যারা এই দেশকে ভালোবেসেছিল, এই দেশের মানুষকে ভালোবেসেছিল এবং মানুষের ভালবাসাকে বুকে ধারণ করে জীবন দিয়েছিল। নাটকের সাথে মানুষকে সম্পৃক্ত করতে নাটকের মানুষরা বেশিদিন চারদেয়ালের ঘেরাটোপে আটকে থাকতে পারলেন না। কেউ কেউ বা কোন কোন দল প্রসেনিআম মঞ্চ নিয়ে খুশি থাকলেও বাংলাদেশের বেশিরভাগ নাট্যকর্মী নাটক নিয়ে নামলো পথে, ঘাটে, বস্তিতে, মাঠে-ময়দানে। কয়েকটি দল তাদের কার্যক্রম প্রসারিত করলো গ্রামে। গ্রামের মানুষকে স্বপ্নবান করতে জড়তা কাটাতে, যাপিত জীবনের সীমাবদ্ধতা জানাতে উদ্যোগী ভূমিকা নিল। কাজের কাজ কিছুটা হলো, কিন্তু তা প্রয়োজনের তুলনায় কম। দেশের রাজনীতি যেখানে উল্টোপথে হাঁটছে সেখানে নাট্যকর্মীদের এই উদ্যোগ চূড়ান্ত সফলতার দিকে যাবে, তেমনটা আশা করাটাই বোধহয় ভুল। আমাদের মঞ্চে উঠে এলো দেশীয় নাটকের পাশাপাশি বিদেশি নাটক। কখনো অনুবাদে কখনো রূপান্তরে। অনেক বিদেশি নাটক বিশাল সাফল্যও পেলো। বিশেষত বিদেশি কমেডি মঞ্চায়নের ইতিহাস তৈরি করলো। সবই হলো নিষ্ঠার সাথে, আন্তরিকতার সাথে কিন্তু দু’টো জায়গায় সমস্যা বয়েই গেল। এক. শুধু শহুরে মানুষের মধ্যে ঘুরপাক খাওয়ার কান্তি ও স্ব-বিরোধিতা। দুই. এই ভাটি-অঞ্চলের মানুষের সংস্কৃতির সে জোরের জায়গা সেটার কাছে পৌঁছাতে না পারা। এই দু’টি সমস্যার সমাধান করতে না পারলে বাংলাদেশের নাটকে বোধহয় প্রকৃত পথ খুঁজে পাওয়া যাবে না। বাংলাদেশের মঞ্চে, মঞ্চের বাইরে অনেক কমিটেড নাট্যকর্মী কাজ করেছেন। মেধাবী তরুণ-তরুণীরা আসছে। সেদিনকে আমরা খুঁজে পাবই যেদিন এই দেশের অসংখ্য মানুষ সেই পুরানো দিনের মত নাটককে খুঁজে বেড়াবে, নাটক দেখে ঘোরলাগা অবস্থায় ফিরে যাবে, কিন্তু সে নাটক হবে ত্রিশ লাখ মানুষের রক্ত দিয়ে কেনা স্বপ্ন বাস্তবায়নের দিশারী। সেদিনকে আনতে হবেই।

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this:
search previous next tag category expand menu location phone mail time cart zoom edit close